Politics

[Politics][bleft]

West Bengal

[West Bengal][grids]

World

[World][bsummary]

National

[National][twocolumns]

নববর্ষের দ্বান্দ্বিকতা : শুভেচ্ছা ও ঘৃণা



শুভমস্তু’ বা ‘কল্যাণ হোক’—এমন কামনা নানা ভাষা ও ভঙ্গিতে মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে সংখ্যাগণনার অতীত প্রত্যুষ থেকে। ছড়া থেকে ধাঁধা, মন্ত্র থেকে সূক্ত, স্তোত্র থেকে কবিতা—সর্বত্র ঘটে আসছে মানুষের কামনারই বহুবর্ণিল বহুভঙ্গিম অভিব্যক্তি। কামনা প্রকাশের জন্য বিশেষ বিশেষ দিনক্ষণের নির্বাচনেও মানুষের প্রবণতা স্মরণাতীতকালের দিগন্তস্পর্শী। স্মরণাতীতকাল থেকেই পৃথিবীর সব দেশের ও সব জাতির মানুষ উৎসব-অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ বিশেষ দিনক্ষণকে বেছে নিয়েছে। সোচ্চার আনুষ্ঠানিকতায় সমষ্টিগত কামনার অভিব্যক্তিদানের জন্যই এ রকম সব উৎসবের উদ্ভব। বিচিত্র পরিবর্তনকে অঙ্গে ধারণ করেও কাল থেকে কালান্তরের মধ্য দিয়ে উৎসবের যে প্রবহমানতা, আসলে তা মানবিক কামনারই বহুশাখা-সমন্বিতা স্রোতস্বিনী। সে স্রোতস্বিনীরই এক বেগবতী শাখা নববর্ষের উৎসব। সে উৎসবে কামনার পদ্ম সহস্রদল মেলে ফুটে উঠবে, তা-ই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু কামনার মানে কি শুধু শুভকামনাই? ভালোবাসাজাত আশীর্বাদের সঙ্গে কি মিশে থাকে না ঘৃণাজাত অভিশাপও? অভিশাপ ছাড়া আশীর্বাদ কি সম্পূর্ণাঙ্গ হয়? ঘৃণা ছাড়া শুভেচ্ছা কি সার্থক হতে পারে? অশিবের ধ্বংস ছাড়া তো শিবের উত্থান অকল্পনীয়। কাজেই একের উত্থানের জন্য কামনা অন্যের ধ্বংস কামনার সঙ্গে গ্রথিত হয়ে থাকে অনপনেয় সূত্রে। অর্থাৎ শুভকামনার মালিকা থেকে আমরা যদি ঘৃণাকে বাদ দেওয়ার প্রয়াস গ্রহণ করি, তাহলে সেই প্রয়াস হবে একেবারেই আত্মঘাতী। সে রকম আত্মঘাতী প্রয়াসে শুভকামনা হয়ে পড়বে ছিন্নমালার ভ্রষ্টকুসুম। তাই উৎসবের দিনে যে শুভকামনা, তাতে ঘৃণার উপস্থিতি একান্ত আবশ্যিক। ঘৃণার দুঃশীল পঙ্কেই ফুটতে পারে ভালোবাসার সুবাস পঙ্কজ, অভিশাপের কঠোর বৃন্তে আশীর্বাদের কোমল কুসুম, দানব-নগরীকে অধিকার করেই উড়তে পারে মানবপুত্রের বিজয়-বৈজয়ন্তী।

অথচ ঘৃণা-ভালোবাসা, অভিশাপ-আশীর্বাদ, দানব-মানবের দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার বিষয়টি আমরা প্রায়শই বিস্মৃত হয়ে থাকি। সে বিস্মৃতির জন্যই উৎসবের দ্বান্দ্বিক তাত্পর্য অনুধাবনেও আমরা ব্যর্থ হই। সে ব্যর্থতার জন্যই আমাদের সব উৎসবের পরিণতি ঘটে বন্ধ্যা একদেশদর্শিতায়, শুষ্ক আনুষ্ঠানিকতায়, আচারের মরুবালুরাশির করুণ ঊষরতায়। এমন ধূসর পরিণতির হাত থেকে উৎসবকে রক্ষা করতে চাইলে উৎসবের দিনের কামনাকে মুক্তি দিতে হবে তার সামগ্রিকতায়; শুভেচ্ছার সঙ্গে ঘৃণা, আশীর্বাদের সঙ্গে অভিশাপের সম্মিলন ঘটাতে হবে সমান মর্যাদায়, সমান আন্তরিকতায়। নতুনের কামনা নববর্ষের উৎসবের একান্ত অনুষঙ্গী ঠিকই, কিন্তু সে কামনা কি জীর্ণ-পুরাতনের ধ্বংস কামনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি সংযুক্ত নয়? সেই জীর্ণ-পুরাতন কি ধ্বংস হতে পারে জীর্ণতাকে যারা পরম মমতায় লালন করে তাদের উত্খাত না ঘটিয়ে?

অথচ আমরা এমনই বদভ্যাসের অধীন যে নির্বিচার শুভেচ্ছায় প্লাবিত করে দিই নববর্ষের দিনটিকে, শুভেচ্ছা জানাই মিত্রশক্তির সঙ্গে শত্রুশক্তিকেও, প্রগতির সঙ্গে প্রতিক্রিয়াকেও, দেশপ্রাণের সঙ্গে দেশবৈরীকেও। আশীর্বাদের পাত্রাপাত্র বিস্মৃত হয়ে যাই বলেই আমাদের আশীর্বাদ মারাত্মক কুফল ফলায়। সেই কুফলেই দানবের বিষভাণ্ড পূর্ণ হয়ে ওঠে কানায় কানায়, দানবদলন মানবপুত্রের অমৃতভাণ্ডও হয়ে ওঠে বিষাশ্রয়ী। দানববাহিত বিষবাষ্প উৎসবের তাত্পর্যকে করে দেয় উল্টোমুখী। সেই উল্টো প্রবাহে নির্বিচার আশীর্বাদের ভেলাই হয়ে ওঠে দানবের নিরাপদ আশ্রয়, মানবের উৎসব স্থানান্তরিত হয়ে যায় প্রেতের বহির্বাটিতে। পিশাচ আর প্রেতরাই হয়ে পড়ে উৎসবের কুশীলব। আমরা যখন বলি, ‘বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও, ক্ষমা করো আজিকার মতো, পুরাতন বরষের সঙ্গে পুরাতন অপরাধ যত’, তখন ক্ষমার রন্ধ্রপথ দিয়ে ঢুকে পড়ে শত্রুবাহিনী, সে বাহিনী অবস্থান নেয় আমাদেরই শিবিরে। এভাবেই আমাদের স্বাধীনতার শত্রুরা হটিয়ে দেয় স্বাধীনতাসংগ্রামীদের; মুক্তিযোদ্ধাদের সবলে সরিয়ে দিয়ে স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়ে যায় রাজাকাররা। শত্রু-মিত্রকে আমরা সমান দৃষ্টিতে দেখেছি বলেই এমনটি ঘটেছে। শত্রুর প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার বলিষ্ঠতার বদলে অসংগত ক্ষমার দুর্বলতা প্রদর্শন করার পরিণতি তো এ রকমই হয়।

অজাতশত্রু হওয়ার ক্লীব অভীপ্সায় আমরা বড় বেশি অধীর। সে অধীরতায় আমরা ভুলে যাই যে : যে অজাতশত্রু, সে অজাতমিত্রও। সবার সঙ্গে মিত্রতার কামনা নিষ্ফল আত্মরতির নামান্তর মাত্র। স্বাধীনতার-ন্যায়ের, মঙ্গলের-সাম্যের-প্রগতির অনুসারী যারা, এসবের বিপরীত পথের অনুগামীদের শত্রুতাকে অঙ্গীকার করে নিয়েই এগোতে হবে তাদের। অর্থাৎ শত্রুকে শত্রু বলে চিহ্নিত করা, কোনোরূপ উদারতায় শত্রুকে এতটুকু শক্তিসঞ্চয়ের সুযোগ না দেওয়া, শত্রু সম্পর্কে কোনোরূপ মোহের প্রশ্রয় না দেওয়া—উৎসবদিনের মন্ত্রে অঙ্গীভূত থাকা উচিত এ সব সংকল্পই।

এ প্রসঙ্গেই আরো স্মর্তব্য যে : যে সমাজের আমরা অধিবাসী, সে সমাজ বিভক্ত নানা পরস্পরবিরোধী স্বার্থের বর্গমণ্ডলীতে, বর্গবিভক্ত সমাজে কোনো উৎসবও হতে পারে না বর্গস্বার্থশূন্য। যে বর্গ অন্যের শ্রমজাত সম্পদ অপহরণ করে সম্পন্ন হয়, আর যে বর্গ নিজের শ্রমের ফল থেকে হয় বঞ্চিত ও হূতসর্বস্ব—সেই দুই বর্গের উৎসব কখনো অভিন্ন মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হতে পারে না, দুইয়ের উৎসবের মন্ত্রও হয় না অভিন্ন। অপহারীবর্গের অন্তর্গত মানুষগুলোর উৎসবে থাকে কপট ঔদার্যের অতিরেক, শত্রু-মিত্রের প্রতি সমান আচরণের ধূর্ত নাগরালি। অন্যপক্ষে অপহূতবর্গের মানুষদের উৎসব ছিন্ন করবে কপট ঔদার্যের যবনিকাজাল, কোষমুক্ত তরবারির মতো সে উৎসব ঘটাবে অকপট সত্যের উলঙ্গ প্রকাশ, সে উৎসব হবে আদিম হিংস্র মানবিকতার স্বজনদের সম্মিলনী। সে উৎসব স্বজন হারানো শ্মশানে অপহারকের চিতা তোলার রুদ্র তপস্যা। এ তপস্যা বশিষ্ঠের ক্ষমার নয়; এ তপস্যা দুর্বাসার ক্রোধের, বিশ্বামিত্রের ঘৃণার। এ তপস্যায় উচ্চারিত হবে যে মন্ত্র, তা কবি-সার্বভৌমের রুদ্র ঘৃণার; ক্ষমা যেখানে ক্ষীণ দুর্বলতা, এ মন্ত্র সেখানে রুদ্র নিষ্ঠুরতার আহ্বায়ক; অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে—উভয়ের জন্যই এ মন্ত্রে থাকবে তৃণসম দহনকারী ঘৃণার বাণী। ঘৃণা, ঘৃণা, ঘৃণা! রুদ্র, প্রচণ্ড, পবিত্র ঘৃণাই অপহূতের সব উৎসবের মর্মকথা। তাই তার নববর্ষের শুভকামনায় জ্বলবে ঘৃণারই রুদ্রশিখা। সে শিখা হবে তাদেরই পথসন্ধানী, যারা ‘দানবের সঙ্গে সংগ্রামের তরে, প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।’

বঞ্চকের প্রতি ঘৃণার মশাল জ্বালিয়ে বঞ্চিতের যে উৎসব, শুধু মন্ত্রোচ্চারণেই সে উৎসব সম্পন্ন হতে পারে না। মন্ত্র মূল্যহীন নয়, কিন্তু যন্ত্রহীন যে মন্ত্র তা একান্তই তাত্পর্যহীন। ‘মন্ত্র দিয়ে কি একপাল ভেড়াকে নিহত করা সম্ভব?’—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিপ্লবী দার্শনিক ভলতেয়ারের জবাব : ‘সম্ভব অবশ্যই, তবে সে মন্ত্রের যথেষ্ট পরিমাণে আর্সেনিক বিষ থাকা একান্তই জরুরি।’ অর্থাৎ মন্ত্রের সঙ্গে চাই বস্তু। মন্ত্রীকে হওয়া চাই যন্ত্রীও।

বঞ্চিতের নববর্ষও তাই শুধু মন্ত্রোচ্চারণের উৎসবই নয়, যন্ত্রধারণেরও উদেযাগলগ্ন। বিমূর্ত মন্ত্রায়ণে বা শুভকামনায় শুধু নয়, সমূর্ত যন্ত্রায়ণ ও বস্তুগত রূপায়ণেই উৎসবের সার্থকতা। উৎসবকে উপলক্ষ করে হূদয়ের আবেগ মস্তিষ্কের বুদ্ধিকে করবে উদ্বুদ্ধ, আবেগ আর বুদ্ধি সৃষ্টির মন্ত্র হয়ে হাতকে করবে প্রণোদিত, হাত মন্ত্রকে করবে যন্ত্রে রূপায়িত।

নববর্ষের শুভেচ্ছা আর ঘৃণায় মন্ত্র আর যন্ত্রেরই ঘটুক শক্তিমন্ত সম্মিলন।


from Breaking Kolkata http://bit.ly/2Uy6ScY

No comments: