‘বেঙ্গল ফ্যাশানিস্তা ২০১৯’র প্রেস কনফারেন্স
‘ও না অন্যরকম’৷ এই শব্দটা শুনতেই শুনতেই ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল শরীরটা ৷ জল-আলো-হাওয়া বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে শরীরগুলো মাখছিল বিদ্রুপ, ব্যঙ্গ, কদর্য ভাষা ৷ যেখানেই যায় ছুটে আসছিল তির্যত মন্তব্য ‘ও না অন্যরকম, ঠিক আমাদের মতো না ৷’মানসিক সত্তার বক্তব্য ছিল এক, আর শরীরটা বলছিল অন্য কথা ৷ ‘অন্যরকম’নয়, মন আর শরীর যাতে একই কথা বলে সেই জন্য চলল প্রচণ্ড লড়াই ৷ পুরুষ শরীরটার উপর ধীরে ধীরে চলল কাটাছেঁড়া ৷ চিকিৎসকদের কুশলী হাতের দক্ষতায় পুরুষ শরীরটা ধীরে ধীরে হয়ে উঠল নারী ৷ তখন তিনি পূর্ণ যুবতী ৷ না এতেও কিন্তু ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের পরিমাণ এক ফোঁটাও কমল না ৷
এরপরের
যুদ্ধটা আরও বড় ৷ শরীরটা তো পুরুষ থেকে নারীর অবয়ব পেল ৷ মনের আর শরীরের
তখন অবাধ সখ্যতা ৷ কিন্তু সরকারি নথি-পত্রের পরিচয় বলছে ‘তুমি পুরুষ’৷ এ
বার যুদ্ধ সরকারি নথি-পত্র বদলের জন্য ৷ বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে সেটাও করা
গেল ৷ খানিক স্বস্তি ৷ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে স্নান সারা হয়ে গিয়েছে ৷
প্রিয় বান্ধবী একটা হ্য়ান্ডলুম শাড়ি উপহার দিয়েছিল নতুন জন্মের দিনটা
উদযাপন করার জন্য ৷ শরীরে জড়ানো হল হ্যন্ডলুম শাড়িটা ৷ চোখে কাজল, ঠোঁটে
মানানসই লিপস্টিক ৷ না চুলটা ছাড়াই থাক আজ ৷ আজ তাঁকে মোহময়ী দেখাচ্ছে ৷
মনের কোণায় চরম আত্মবিশ্বাস ৷ বাড়ির গলি ছেড়ে বড় রাস্তায় পা বাড়ানো
গেল ৷ অমনি কানে এল সেই পরিচিত ফিসফিস কথাবার্তা-‘কেমন একটা অন্যরকম লাগছে
না!’আবার মনটা অপমানে কুঁকরে এল গোটা শরীর ৷
রূপান্তরিত
মহিলা কিংবা পুরুষদের এমন করুন কাহিনি হয়তো সামনেও আসে না ৷ অপমান আর
লাঞ্ছনায় গুমরে মরেন তাঁরা ৷ আর পাঁচটা নারী ও পুরুষের মতো যে তাঁরা
সুস্থ-স্বাভাবিক-সেই কথাটা হয়তো সমাজের একটা বড় অংশ এখনও মেনে নিতে
পারেনি ৷ বা বলা ভাল মানতে চায় না ৷ তবে সব কিছুরই তো শেষ আছে, আছে শুরুও ৷
আর সেই শুরুয়াতটা করল ‘বেঙ্গল ফ্যাশানিস্তা ২০১৯’৷ বাংলার বুকে শুরু হতে
চলেছে এমন এক ফ্যাশন শো, যা হয়তো আরও অনেক আগে শুরু হলে ভাল হত ৷ কিন্তু
খানিক পরেই হোক শুরু তো হল ৷ ‘বেঙ্গল ফ্যাশানিস্তা ২০১৯’-এর সেই উদ্যোগ
অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য ৷ আসলে এই ফ্যাশন প্রতিযোগিতায় একসঙ্গে অংশে নিতে
পারবেন নারী-পুরুষ এবং রূপান্তরকামী কিংবা রূপান্তরিত নারী ও পুরুষরা ৷ না
কোনও ভেদাভেদ নেই একসঙ্গে সবাই লড়বে একসঙ্গে ৷ নিজেদের যোগ্যতার নিরিখেই
পাবেন সেরার সেরা স্বীকৃতি ৷ জলপাইগুড়ির মেয়ে পৌলমী সরকার ৷ জানালেন,
উত্তরবঙ্গে বড়া হয়ে ওঠা ৷ কিন্তু উত্তরবঙ্গে তেমনভাবে ফ্যাশন নিয়ে
কাজ-কর্ম হয় না ৷ তাই আইটি কর্মী হয়ে কলকাতায় আসার পর-এই নিয়ে একটা কাজ
করার বাসনা জেগেছিল মনের মধ্যেই ৷ আর সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘বেঙ্গল
ফ্যাশানিস্তা ২০১৯’-এর পরিকল্পনা ৷ এমন এক ফ্যাশন শো যেখানে কোনও ভাগাভাগি
নেই ৷ সবাই একসঙ্গে লড়াই করতে পারবে ৷ ‘‘ছেলে-মেয়ে আর রূপান্তরকামীরা
একসঙ্গে লড়াই করবেন ৷ নিজের যোগ্যতাতেই করতে হবে লড়াই ৷ টলিউড আর বলিউডের
নামী দামি বিচারকরা তাঁদের মধ্যে সেরাকে বেছে নেবেন ৷’’বললেন পৌলমী ৷
তবে,
এই ফ্যাশন প্রতিযোগিতা কিন্তু অন্যান্য প্রতিযোগিতা থেকে অনেকটাই আলাদা ৷
আসলে শুধু সেরা মডেল বেছে নেওয়া নয় ৷ এই ফ্যাশন শোয়ের মাধ্যমে খোঁজ চলবে
বাংলার সেরা ফ্যাশন ডিজাইনার, মেকআপ আর্টিস্ট এবং ফ্যাশন ফোটোগ্রাফারদের ৷
শিলিগুড়ি, মেদিনীপুর, কলকাতা, মালদা, দুর্গাপুর, দার্জিলিং জুড়ে শুরু
হচ্ছে প্রতিযোগির খোঁজ। এরই সঙ্গে দুস্থ ছেলে ও মেয়েদেরও সুযোগ করে দেওয়া
হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা ৷ ‘সে হতে পারেন, কারও বাড়ি কাজের মেয়ে ৷
যদি তাঁর প্রতিভা থাকে, তবে তিনি অবশ্যই সুযোগ পাবেন ‘বেঙ্গল ফ্যাশানিস্তা
২০১৯’-এর মঞ্চে ৷ মডেলদের গ্রুমিংয়ের দায়িত্ব নেবেন সুপারমডেল মাধবলীতা
মিত্র এবং পল্লব ঘোষ ৷ মাধবীলতা বললেন, ‘‘সম্মান সকলেরই প্রাপ্য ৷ আর একজন
মানুষের মধ্যে যদি প্রতিভা থাকে, তবে সেটাই বিবেচ্য হওয়া উচিত ৷ আর সেই
সম্মান আদায় করে নেওয়ার মঞ্চই হচ্ছে এই প্ল্যাটফর্ম ৷ আর এমন উদ্যোগা
গোটা দেশে আগে কখনও হয়নি ৷’’উঠতি ফ্যাশন ডিজাইনারদের গ্রুমিং করাবেন
বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পাল ৷ মেকআপ আর্টিস্টদের দায়িত্ব
নিচ্ছেন অনিরুদ্ধ চাকলাদার ৷
Labels:
Entertainment


No comments: